লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : রহিমা আক্তার ( ছদ্ম নাম), বয়স ৩৫। প্রায় ১০ বছর আগে তাকে স্বামি মারা গেছেন। কলেজ পড়ুয়া দুই মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে খুব কষ্টে মানবেতর দিন পার করছিলেন। গ্রামের এক লোক এসে ৬০০০ টাকার বেতনের কথা বলে
বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজে চাকুরী নিয়ে দেয়। বেতন বোনাস নিয়ে সুন্দরভাবে দিনগুলো কাটছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে বৃহত্তম নোয়াখালীর শিল্পপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে রাখালিয়া গ্রামে বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে অসহায় অসুস্থ্য রহিমা বেগমসহ পরিবারের চার সদস্যের মানবেতর জীবনযাপন চলছে।।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকালে কথা হয় বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজের অসহায় নারী শ্রমীক রহিমা বেগম ও সুমি আক্তার সহ ১২ জন নারী ও পুরুষ শ্রমীকের সাথে। তাদের কেউ বাবা, মা, স্বামী নেই। গত ৫ মাস ধরে দুই বেলা না খেয়েই মানবেতর জীবন পার করতে দেখা গেছে।
পাঁচ মাস রায়পুরের বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার কর্মহারা দুই হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেত দিনযাপন করছে।
এর আগে বন্ধ থাকা কারখানার এসব শ্রমিকের অনেকেই কারখানা খুলে দেওয়াসহ বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন।। এসব শ্রমিকদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ব্যাংকিং জটিলতা নিরসন করে খুলে দেওয়ার দাবি কারখানা কর্তৃপক্ষের।
রায়পুর থানা পুলিশ ও শ্রমিকরা জানায়, এক সময় নানা কারণে এই কারাখানাটি বিখ্যাত হলেও বর্তমানে লক্ষ্মীপুরে অবহেলিত হিসেবেই পরিচিত। কর্মের কারণে লক্ষ্মীপুরে লাখ মানুষ বসবাস করছেন। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে প্রায় অর্ধ-শতাধিক।
উপজেলার সোনাপুর ইউপির রাখালিয়া এলাকার বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজে ২ বছর কাজ করেছেন মহাদেব গ্রামের সুমি আক্তার। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন নীজ এলাকায়। সুমি আক্তার এই প্রতিবেদককে বেলন, তাদের কারখানার সব শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। পুরুষ শ্রমিক যারা ছিল, তাদের বেশিরভাগই অন্যত্র নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছে। কিন্তু আমরা যুবতি আর মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও চাকরি পাচ্ছি না। আমাদের কয়েকজন গত এক মাসে সদরে বিসিক শিল্প নগরী এলাকায় যোগাযোগ করেছি, কিন্তু নতুন চাকরি পাইনি। এখন বিধবা নারী হয়ে একার আয় দিয়ে কোনোরকমে জীবনযাপন করছি।
একই এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেন বলেন, চাকরি হারিয়ে আমরা ঘরে বসে আছি। জমানো কিছু টাকা দিয়ে চাল, সবজি ও মাছ এনে খাচ্ছি। নতুন চাকরির সন্ধান করছি; কিন্তু বেতন খুবই কম বলছে। তাই আরও খোঁজাখুঁজি করছি।
বৃহত্তম নোয়াখালির নামকরা ঐতিহাসিক রায়পুরের রাখালিয়া এলাকার বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজ দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছিলো। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মালিক টিপু সুলতান কারখানার সামনে নোটিশ টানিয়ে দেন চলতি বছরের গত ১৫ মে থেকে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করার।
রায়পুরের বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক টিপু সুলতান ও সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বিপ্লব পাল মোবাইল ফোনে জানান, গত ২০ বছর লাভ- লসে মিলিয়ে কারাখানাটি চালিয়ে আসছিলাম। তাদের কারখানায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেকার হয়েছেন। শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা লে-অফ তুলে নিয়ে সরকারের সহযোগিতা চাইছি। প্রধানমন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ করছি ব্যাক টু ব্যাক এলসি ওপেন করে সব ব্যাংকিং সুবিধাসহ লে-অফ তুলে নেওয়ার। একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। আমরা নিরুপায়।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ব্যাংক সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে বলে জানতে পারছি। কর্মহীন প্রায় সহস্রাধিক নারী শ্রমিকদের অনেকেই বেঙ্গল সু কারখানাটি খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন চালায়। এসব শ্রমিককে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। কয়েকবার বৈঠক করে বেতনে বিষয় সমাধান করা হয়। দেখলাম মালিক পক্ষ পুরো কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।
এবিষয়ে রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া বলেন,,লক্ষীপুর জেলার অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বেঙ্গল স্যু ইন্ডাস্ট্রিজ । প্রায় ২০০০ নারী পুরুষ শ্রমিক এখানে কাজ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা নিয়ে এসেছে । প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ায় তারা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে । তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ প্রতিষ্ঠানটি চালু করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মের ব্যবস্থা করে দিবেন।