আবুল কাশেম রুমন,সিলেট প্রতিনিধি : সময়,দিন যতই গড়াচ্ছে, পাল্লা দিয়ে পাড়ছে নিত্যজীবনের চাহিদা, আর এ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সিলেটের মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষেরা। ব্যয় বাড়লে, বাড়েনি আয়, কমেছে প্রবাসী অনুদান। তবে সিলেটে জুড়ে সবচেয়ে কম হয়েছে বাল্যবিবাহ। এদিকে শিক্ষার হার পিছিয়ে পড়ার একমাত্র কারণ খুঁজে দেখা যায়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিটি ২০ থেকে ২৫ বছরের তুরণ তরুণীরা বিদেশমুখী অনেকে পড়ালেখায় থাকা অবস্থায় লন্ডন, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মের জন্য পাড়ি জমান। সূত্রে উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) সূত্রে তথ্য জানা গেছে।
এমআইসিএসের জরিপ থেকে জানা যায়, ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে, ৬৭ শতাংশ। এরপর খুলনায় ৬৫ শতাংশ, রংপুরে ৬৩ শতাংশ ও বরিশালে ৬১ শতাংশ। ঢাকায় এই হার ৫৩ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫১ শতাংশ। সবচেয়ে কম সিলেটে, ২৯ শতাংশ। গ্রামে হার শহরের চেয়ে বেশি, প্রায় ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশের বিপরীতে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এমআইসিএসের হিসাবে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। আর ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ তখন বিবাহিত ছিলেন।
২০১৯ সালে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ হার কমেছে, তবু প্রায় প্রতি দু’জন তরুণীর একজনের বিয়ে হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই। ইউনিসেফের বর্তমান শিশু সুরক্ষা তথ্যেও বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় হার হিসেবে এই ৪৭ দশমিক ২ শতাংশই ব্যবহার করা হচ্ছে।
১৯৯৩-৯৪ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)-এর তথ্যানুসারে, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৭৩ শতাংশেরই বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর বয়সের আগে। ২০২২ সাল নাগাদ এই হার কমে ৫১ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ প্রায় তিন দশকে মাত্র ২২ শতাংশ পয়েন্টের হ্রাস ঘটেছে যার গড় হার বছরে ০.৭ পয়েন্ট। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের তুলনায় এই অগ্রগতির হার অনেক ধীর।
বিশ্বজুড়ে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা শক্তিশালী নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হলেও, এখানে সেগুলোর প্রভাব তুলনামূলক ভাবে কম দেখা গেছে। ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (গওঈঝ) ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ২৫ শতাংশেরই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।
এমনকি সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে প্রায় একজন অর্থাৎ ৩১.৫ শতাংশ ১৮ বছর বয়সের আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। শহর ও গ্রামের মধ্যকার ব্যবধানও ছিল সামান্য, এক্ষেত্রে হার ছিল যথাক্রমে ৪২.৫ শতাংশ ও ৪৯.৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) ২০২৪ সালের একটি ‘স্মল-এরিয়া এস্টিমেট’ বা ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৫৪১টি উপজেলায় ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৩৮.৩ থেকে ৬৫.৭ শতাংশের মধ্যে।
খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে এই হার সবচেয়ে বেশি। খুলনার ৬৪টি উপজেলার সবকটিতেই এই হার ৬০ শতাংশের বেশি (৬০.১-৬৪.০ শতাংশ), রাজশাহীর ৭০টি উপজেলার মধ্যে ৬৯টিতেই (মাটিহার ছাড়া) একই চিত্র দেখা গেছে। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে (৬৫.৭ শতাংশ); এছাড়া বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও বাল্যবিবাহের উচ্চ হার পরিলক্ষিত হয়েছে।
বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এই হার ৪৮ থেকে ৫৩ শতাংশের মধ্যে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে শাহবাগে হারটি সর্বনিম্ন (৩৯ শতাংশ) এবং মিরপুরে সর্বোচ্চ (৬০ শতাংশ)।
এর বিপরীতে, সিলেটের প্রতিটি উপজেলায় এই হার ৪৩ শতাংশের নিচে (৩৮.৩-৪২.৮ শতাংশ) রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন হার সুনামগঞ্জে এবং উপজেলা পর্যায়ে দেশের সর্বনিম্ন হারটি (৩৮.৩ শতাংশ) সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় রেকর্ড করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারীরা কম বয়সে বিয়ে করেন। পাশাপাশি, এই বিভাগ গুলোর নারীদের মধ্যেই পরে বিয়ে করার আকাঙ্খা বা ইচ্ছা প্রকাশের হার সবচেয়ে বেশি।
২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই তিন বিভাগে প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স (সবফরধহ ধমব) হলো ১৬ বছর, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর অর্থ হলো, সেখানকার অর্ধেক নারীর বিয়ে ১৬ বছর বা তার কম বয়সে হয়েছে।
এই বিভাগগুলোতেই এমন বিবাহিত নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যারা মনে করেন যে পরে বিয়ে করলে ভালো হতো, রাজশাহীতে ৪৭ শতাংশ, খুলনায় ৪২ শতাংশ এবং রংপুরে ৩৭.৮ শতাংশ।
এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ। বাংলাদেশের একমাত্র এই বিভাগেই প্রথম বিয়ের গড় বয়স ১৮ বছরের বেশি ১৮.৮ বছর।