
রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ বা নির্বিচারে ডাম্পিং করা হলে ঢাকা অবরুদ্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ব্যাটারিচালিত রিকশার মালিক-শ্রমিক নেতারা। একই সঙ্গে অটোরিকশার চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ না করে চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈধ লাইসেন্স ও রোড পারমিটের আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা মালিকদের গাড়ি যাচাই করে বৈধতার সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানান তারা।
সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও মিছিল করেন ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা। পরে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল নিয়ে তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হন। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। এতে প্রেস ক্লাব ও আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভ চলাকালে কাকরাইল মোড়ে সদরঘাট-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী ভিক্টর ক্লাসিক গোল্ড সিটি নামের একটি বাসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে বাসের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পথচারীরাও দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করেন। এ সময় আন্দোলন ছেড়ে অটোরিকশা চালিয়ে সড়ক দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা কয়েকজন চালককে আন্দোলনকারীরা মারধর করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এর মধ্যে ছিল—‘রাস্তা আছে যেখানে, অটো চলবে সেখানে’, ‘ভাত দে, কাপড় দে, নইলে অটো চলতে দে’, ‘মালিক শ্রমিক জনতা, গড়ে তোলো একতা’, ‘আমার ভাই জেলে কেন, জবাব চাই’ এবং ‘পুলিশের হয়রানি বন্ধ কর, করতে হবে’।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে সমস্যার সমাধান হবে না। সরকার চালকদের প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্সের ব্যবস্থা করলে নিয়ম মেনে চলা এবং অনিয়ম করা গাড়ি সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এতে রাজধানীর সড়কেও শৃঙ্খলা ফিরবে বলে দাবি করেন তারা।
তাদের অভিযোগ, পুলিশ ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের হয়রানি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি ডাম্পিং করা হচ্ছে। অটোরিকশা জব্দ করে পাঁচ হাজার টাকা করে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন চালকরা। তারা বলেন, যেসব সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের সুযোগ রয়েছে, সেখানে তাদের চলাচল করতে দিতে হবে। পাশাপাশি পুলিশি হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করা ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোও চিহ্নিত করার দাবি জানান। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় ব্যবসা করছেন এমন মালিকদের গাড়ি যাচাই করে বৈধতার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত চালকদের লাইসেন্স এবং নির্ধারিত এলাকায় চলাচলের জন্য রোড পারমিট দেওয়ার দাবি করেন তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি এস এ আবু বকর বলেন, অনেক চালক ও ক্ষুদ্র মালিক ৬৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ করে রিকশা কিনেছেন। ডাম্পিংয়ের নামে নির্বিচারে গাড়ি জব্দ করা হলে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়বেন। অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ায় তাদের আপত্তি নেই। তবে ডাম্পিংয়ের নামে হয়রানি মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা সরকারকে সহযোগিতা করবেন। কিন্তু তাদের মতামত উপেক্ষা করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা না করার জন্য কর্মীদের সতর্ক করেন তিনি। পুলিশ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান।
ঢাকা মহানগর মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিকসহ সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
অবরোধে অংশ নেওয়া অটোরিকশাচালক মিল্লাদ মিয়া বলেন, অটো চার্জ দেওয়ার স্থানগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদসহ কয়েকটি দাবিতে তারা সড়ক অবরোধ করেছেন। দাবি না মানা পর্যন্ত তারা সড়ক ছাড়বেন না।
আরেক চালক সুমন অভিযোগ করেন, ট্রাফিক পুলিশ অটোরিকশাচালকদের হয়রানি করে এবং গাড়ি ডাম্পিং করে। গাড়ি জব্দ করে পাঁচ হাজার টাকা করে মামলা দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। এসব হয়রানি বন্ধের দাবি জানান তিনি।
মালিক-শ্রমিক নেতারা বলেন, দেশে লাখ লাখ মানুষ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হঠাৎ করে এসব যানবাহন বন্ধ করে দিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তাই অবৈধভাবে চলাচলকারী গাড়ির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বৈধতার সুযোগ থাকা গাড়িগুলোকে নিবন্ধন ও রোড পারমিট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
তারা আরও বলেন, সরকার চাইলে প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট ও সময় নির্ধারণের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এতে একদিকে চালকদের জীবিকা রক্ষা হবে, অন্যদিকে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে।
তবে আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের সময় বাস ভাঙচুর ও চালকদের মারধরের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মালিক-শ্রমিক নেতারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বললেও এ ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি হলে সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বক্তারা দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। অটোরিকশা বন্ধ বা নির্বিচারে ডাম্পিং অব্যাহত থাকলে ঢাকা অবরুদ্ধ এবং চার্জিং পয়েন্টের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করার কথাও বলেন তারা।
তবে নেতারা বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য সংঘাত নয়; আলোচনার মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশার বৈধতা, চালকদের অধিকার এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।